ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট সংকট, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ :

দেশে উদ্বেগজনক ভাবে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। আক্রান্ত রোগীর পাশাপাশি আসছে মৃত্যুর খবর। এরমধ্যে চলতি আগস্ট ও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ভয়াবহ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পর্যাপ্ত ডেঙ্গু কিট নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের সংকট এবং অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। 


এতে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়সহ ডেঙ্গুর প্রকোপ ও জটিলতা বাড়ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর কবিরুল বাশার সতর্ক করে বলেন, আগস্টজুড়েই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে পারে এবং সেপ্টেম্বরেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। তিনি বলেন, আগস্টে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নাও পৌঁছাতে পারে। এ বছর সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায় সেপ্টেম্বরেও হতে পারে। তবে আমরা বলতে পারি, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি। এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং উৎসস্থল ব্যবস্থাপনা। তিনি বলেন, মূল কৌশল হলো মশার প্রজননস্থল নির্মূল করা। যেসব প্রজননস্থল অপসারণ বা ধ্বংস করা সম্ভব নয়, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশক বা মশার বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী উপাদান ব্যবহার করতে হবে। 


মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকারও আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অন্যান্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে মশা নিয়ন্ত্রণ এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গু বিষয়ক প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগস্টেও প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিনই ১ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তথ্য মতে, চলতি বছরে ডেঙ্গুজনিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৯ জনে। এর মধ্যে শুধুমাত্র জুলাই মাসেই ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে মোট মৃত্যুর সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৯৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। 


চলতি বছরে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১৮,৬৭৩ জন। এর মধ্যে জুলাই মাসেই ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ২০৬ জন এবং আগস্ট মাসের প্রথম ৭ দিনেই ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৩৬৩ জন। তাই জুলাই থেকে চলতি আগস্টে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে ডেঙ্গু যখন ভয়ানক পরিস্থিতি ছড়াচ্ছে এবং এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী তিন মাস দেশের জন্য ভয়ানক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে তখনই জানা গেল ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিটের সঙ্কটের কথা। তাই দ্রুত পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 


যদিও অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে কিটের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি)-এর সর্বশেষ মজুদ প্রতিবেদনে (১৪ জুলাই) এনএস১ টেস্টেও কীটের মজুদ মাত্র ৫৩ হাজার ২৫০টি, আইজিজি/আইজিএম টেস্টের মজুদ ৪৩ হাজার ৭২৫টি এবং আরকে-৩৯ কালা জ্বর-এর মজুদ সম্পূর্ণ শূন্য হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। এতো অল্প পরিমাণ কিটের ইতোমধ্যে অনেক ব্যবহার হয়ে গেছে। তাই দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নিলে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অসাধ্য হয়ে পড়বে বলে শঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং চলতি বছর সংক্রমণের প্রকোপ অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। 


ফলে এই সময়ে প্রয়োজনীয় ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিটের সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ নিশ্চিত করা না গেলে ডেঙ্গু মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এ বিষয়ে সিডিসি লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. হালিমুর রশিদ ইনকিলাবকে বলেন, কীট সংকট এখনো বলা যাবে না। তবে সঠিক সময়ে ক্রয় করতে না পারলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) কীট ক্রয় করে সারাদেশে বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি হাসপাতালগুলো নিজস্বভাবেও কীট ক্রয় করে। 


ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেন, ডেঙ্গুর ভয়াবহতার কথা চিন্তা করেই প্রস্তুতি হিসেবে কীট ক্রয়ের জন্য অনেক আগেই সিএমএসডিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দরপত্রের সবকিছু মেনে একটি প্রতিষ্ঠানকে (সর্বনিম্ন দরদাতা) ক্রয়ের জন্য কার্যাদেশও প্রদান করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কিছু কিট ইতোমধ্যে প্রদানও করেছে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানটি কার্যাদেশ পায়নি (দরপত্রে দ্বিতীয়) হয়েছে তারা মামলা করে দিয়েছে। এখন আমাদের কি করার আছে। আদালত যেভাবে বলবে সেভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অনুসন্ধানে জানা যায়, কিট ক্রয়কার্যক্রমটি একটি ই-জিপি টেন্ডারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে স্টারলিং মাল্টি টেকনোলজিস লি.-এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার এর আইনানুগভাবে চুক্তি সম্পাদিত হয়। ই-জিপি বিধি অনুযায়ী চুক্তি সম্পাদনের পর সংশ্লিষ্ট টেন্ডারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে একই টেন্ডারের আওতায় পরবর্তীতে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কার্যাদেশ প্রদান বা নতুন সরবরাহ আদেশ জারির সুযোগ আছে কি না, তা বর্তমানে আইনি বিতর্কের বিষয়। 


এদিকে স্টারলিং মাল্টি টেকনোলজিস লি. ইতোমধ্যে চুক্তির আওতায় কিছু কিট সরবরাহ করেছে। পরবর্তীতে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী আরেক প্রতিষ্ঠান ওএমসি হেলথকেয়ার বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর রিভিউ প্যানেলে একটি রিভিউ আবেদন দাখিল করে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবি অনুযায়ী, রিভিউ প্যানেলের সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি উচ্চ আদালতে গড়ায়। পরবর্তীতে হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগে পৃথক আদেশ জারি হওয়ায় বর্তমানে বিষয়টি বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর ফলে অবশিষ্ট কিট সরবরাহ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আইনি জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে প্রয়োজনীয় ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিটের সরবরাহ আরও বিলম্বিত হতে পারে, যা চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে। 


কার্যাদেশ অনুযায়ী, কিট ক্রয় প্যাকেজে সর্বমোট ৫ লাখ ৭ হাজার ১২০ টি কিট ক্রয়ের বিষয় রয়েছে, যার মধ্যে ডেঙ্গু কিটের পাশাপাশি ৭২ হাজার টি আরকে-৩৯ কালা জ্বর কীটও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আপত্তির বিষয়টি মূলত আরকে-৩৯ কালা জ্বর কিটকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত হলেও এর প্রভাব পুরো প্যাকেজের সরবরাহের ওপর পড়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে কালা জ¦র কীট আমদানির অনুমতিও প্রদান করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। দরপত্রে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কোটেশন তথ্য মতে, ওএমসি হেলথকেয়ার-এর প্রস্তাবিত দর স্টারলিং মাল্টি টেকনোলজিস লি.-এর দরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। হিসাব অনুযায়ী, ওএমসিকে কার্যাদেশ দেয়া হলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হবে। 


ওএমসি হেলথকেয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজবাউল কবিরের সঙ্গে মামলার বিষয়ে মোবাইলে কথা বলতে চাইলে তিনি বিষয়টি শুনে এ নিয়ে কথা বলতে রাজি নন বলে মোবাইল কলটি কেটে দেন। অবশ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল ইনকিলাবকে বলেছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ এবার বাড়তে পারে। চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন এবারের ডেঙ্গুর রূপ হবে ভয়াবহ। যার নাম হেমোরোজিক। ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে হতে পারে রক্তক্ষরণও। সুতরাং আগে থেকেই সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দুই থেকে তিনদিন পর মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথা এবং আগে থেকেই কীট ক্রয়ের জন্য বলা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে কিট সরবরাহ করছে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান। আদালতের নির্দেশেই তারা ধাপে ধাপে কিট দিচ্ছে। কিট ক্রয়ে কোন জটিলতা নেই বলে