ইসলামী ভোটের বিভাজন ও নির্বাচনী কৌশলের অঙ্ক: ইঞ্জি: মো: মিজানুর রহমান

ইঞ্জি: মো: মিজানুর রহমান
প্রকাশ :

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি বিষয় আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—সংগঠনগত শক্তি ও জনভিত্তি থাকলেও কৌশলগত দুর্বলতা এবং পারস্পরিক অনৈক্য বড় রাজনৈতিক শক্তিকেও কার্যত প্রান্তিক করে দিতে পারে। বিশেষত ইসলামী ধারার দলগুলোর নির্বাচনী ফলাফল সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।


চরমোনাই পীর সাহেব নির্বাচনের আগে দাবি করেছিলেন, তাদের দল ১৪৬টি আসনে ‘এ গ্রেড’ অবস্থানে রয়েছে। বাস্তব ফলাফল অবশ্য সেই দাবিকে সমর্থন করেনি। তিনি নিজে যে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, সেখানেই পরাজিত হয়েছেন বড় ব্যবধানে। সারাদেশে দলটির প্রাপ্ত আসনসংখ্যা ন্যূনতম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থেকেছে। অথচ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ আসনেই চরমোনাইয়ের প্রার্থী গড়ে প্রায় ১০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। অর্থাৎ জনসমর্থন একেবারে অনুপস্থিত ছিল না; সমস্যা ছিল ভোটকে জয়ে রূপান্তর করার সমীকরণে।


অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী বহু আসনে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। পিরোজপুর-২ আসনে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে মাত্র ৭০ ভোটে হেরেছেন। খুলনায় মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রায় ২০০০ ভোটে পরাজিত হয়েছেন। প্রায় ৫৩টি আসনে জামায়াত ৫০০০ ভোটের কম ব্যবধানে হেরেছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়। এই তথ্যগুলো একটি সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে—ইসলামী ভোট যদি বিভক্ত না হতো, তাহলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত।


রাজনীতিতে সম্ভাবনা আর বাস্তবতার ব্যবধানটাই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। চরমোনাই ও জামায়াত যদি নির্বাচনের আগে কৌশলগত সমঝোতায় পৌঁছাতো, তাহলে হাতপাখা প্রতীকের ভোট একত্রিত হয়ে বহু আসনে ফলাফল বদলে দিতে পারত। অনুমান করা কঠিন নয় যে, অন্তত ৪০–৫০টি আসনে জয়-পরাজয়ের চিত্র ভিন্ন হতে পারত। একইসঙ্গে চরমোনাইও সংসদে একাধিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারত। কিন্তু অহংকার, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব হতে দেয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির নির্বাচনী কৌশল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জমিয়তের একটি অংশকে নির্দিষ্ট কয়েকটি আসন দিয়ে এবং অপর অংশকে ধানের শীষ প্রতীক ব্যবহার করতে দিয়ে কার্যত জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি বিকল্প শক্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এতে ২৯৫টি আসনে জামায়াতকে ট্যাকল দেওয়ার মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাজনৈতিক কৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিঃসন্দেহে সফল একটি পদক্ষেপ। যদিও জমিয়তের কাউকেই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী করা সম্ভব হয়নি, তবুও তাদের মাঠে নামানোই ছিল মূল লক্ষ্য—ভোটের বিভাজন।


একই সঙ্গে ১১ দলীয় জোট থেকে চরমোনাইকে বের করে আনার ঘটনাও রাজনৈতিক হিসাবের অংশ হিসেবে দেখা যায়। জমিয়তি আলেমদের উস্কানি বা মতবিরোধকে কাজে লাগিয়ে ইসলামী ঐক্য আরও দুর্বল করা হয়েছে—এমন অভিযোগ রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত। হেফাজত সংশ্লিষ্ট কিছু আলেম কিংবা জামায়াতবিরোধী অবস্থানে থাকা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদেরও নির্বাচনী আবহে প্রভাবক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।


সব মিলিয়ে এই নির্বাচন দেখিয়েছে, ভোটের অঙ্ক শুধু জনসমর্থনের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে জোটগঠন, প্রতীকের কৌশল, প্রার্থী বাছাই এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারের ওপরও। ইসলামী ধারার দলগুলোর জন্য এই নির্বাচন একটি বড় শিক্ষা—ভোটব্যাংক থাকলেই যথেষ্ট নয়, সেটিকে সমন্বিত শক্তিতে রূপ দিতে না পারলে ফলাফল অন্যের ঘরে যায়।


রাজনীতিতে আবেগের স্থান থাকলেও, শেষ পর্যন্ত জয়ের নির্ণায়ক হলো কৌশল ও ঐক্য। ইসলামী দলগুলো যদি ভবিষ্যতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চায়, তবে আত্মসমালোচনা ও বাস্তববাদী জোটনীতির বিকল্প নেই। অন্যথায়, বিভক্ত ভোটের এই পুনরাবৃত্তি তাদের সম্ভাবনাকে বারবার ভেঙে দেবে—আর কৌশলী প্রতিদ্বন্দ্বীরা সেই সুযোগই নেবে।